ই-পাসপোর্ট কিভাবে করবেন, আবেদনের নিয়ম এবং খরচ

Img

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম এবং বিশ্বে ১১৯ তম দেশ হিসেবে গত ২২ জানুয়ারী, ২০২০ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশে চালু হয়েছে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম। ঐদিন আনুষ্ঠানিক ভাবে ই-পাসপোর্ট কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এখন থেকে বাংলাদেশের নাগরিকরা অত্যাধুনিক এই ই-পাসপোর্ট করতে পারবেন খুব সহজেই। 

ই-পাসপোর্ট চালু হবে এই ঘোষণার পর থেকেই ই-পাসপোর্ট এর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন দেশবাসী। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশ প্রবেশ করল ই-পাসপোর্ট এর যুগে। কিন্তু ই-পাসপোর্ট চালু হলেও অনেকের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়ে গেছে, বিশেষ করে প্রবাসীরা ই-পাসপোর্ট সম্পর্কে জানতে বেশি আগ্রহী। যেমন ই-পাসপোর্ট কি? এমআরপি এবং ই-পাসপোর্ট এর মধ্যে পার্থক্য কি? ই-পাসপোর্ট এর সুবিধা কি? ই-পাসপোর্ট কিভাবে করতে হয়? ই-পাসপোর্ট এর জন্য কিভাবে আবেদন করব? ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগবে? ই-পাসপোর্ট এর মেয়াদ কতদিন? ই-পাসপোর্ট করতে কত খরচ হয়? কোথায় আবেদন করতে হবে এবং পেতে কতদিন লাগে, ইত্যাদি নানান প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন অনেকেই। আমাদের আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা ই-পাসপোর্ট সম্পর্কে এই সকল প্রশ্নের উত্তর সহ বিস্তারিত আলোচনা করব:

চলুন প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক ই-পাসপোর্ট কি?

ই-পাসপোর্ট হল ইলেকট্রনিক মাইক্রোপ্রসেসর চিপযুক্ত বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট। এমআরপি পাসপোর্টের মতো ই-পাসপোর্ট এর বই দেখতে একই রকমের তবে বইয়ে প্রথমে যে তথ্য সংবলিত দুইটি পাতা থাকে, ই-পাসপোর্টে তা থাকবে না। এর পরিবর্তে সেখানে পালিমানের তৈরি একটি কার্ড ও অ্যান্টেনা থাকবে। সেই কার্ডের ভেতর চিপ এর মধ্যে সংরক্ষিত থাকবে পাসপোর্টধারীর সব তথ্য।

ই-পাসপোর্টে একজন ব্যক্তির বায়োমেট্রিক ও বায়োগ্রাফিক সর্বমোট ৪১টি তথ্য থাকবে। এই তথ্যগুলোর মধ্যে ২৬টি তথ্য খালি চোখে দেখা যাবে। পাসপোর্টধারীর তিন ধরণের ছবি, ১০ আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ স্ক্যান - এসব বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষিত থাকবে ই-পাসপোর্ট এ, ফলে যেকোনো দেশের কর্তৃপক্ষ সহজেই ভ্রমণকারীর সম্পর্কে সব তথ্য জানতে পারবেন।

ই-পাসপোর্ট এর সুবিধা কি?

ই-পাসপোর্টধারীরা এমআরপি পাসপোর্ট এর গতানুগতিক সুবিধাগুলোর পাশাপাশি আরও কিছু বাড়তি সুবিধা পাবেন। ই-পাসপোর্টের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এর মাধ্যমে ই-গেট ব্যবহার করে খুব দ্রুত ও সহজে ভ্রমণকারীরা যাতায়াত করতে পারবেন। এজন্য তাদেরকে ভিসা চেকিং এর লাইনের দাড়াতে হবে না। ই-গেটের নির্দিষ্ট স্থানে পাসপোর্ট রেখে দাঁড়ালে ক্যামেরা ছবি তুলে নেবে। থাকবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইয়ের ব্যবস্থাও। সব ঠিক থাকলে তিনি ইমিগ্রেশন পেরিয়ে যেতে পারবেন। কোনো গরমিল থাকলে জ্বলে উঠবে লালবাতি। কারও বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকলে, সেটিও জানা যাবে সঙ্গে সঙ্গে। এর মাধ্যমে ই-পাসপোর্টধারী তার ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে পারবে।

ই-পাসপোর্ট কিভাবে করতে হয়?

ই-পাসপোর্টের জন্য সরাসরি অনলাইনে অথবা পিডিএফ ফর্ম ডাউনলোড করে তা পূরণ করে আবেদন করা যাবে। এতে কোনো ছবি এবং কোনো ধরনের কাগজপত্র সত্যায়নের প্রয়োজন নেই।

ই-পাসপোর্ট এর জন্য কিভাবে আবেদন করবেন?

https://epassport.gov.bd ই-পাসপোর্ট এর এই ওয়েব পোর্টালে গিয়ে পাসপোর্ট করা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য জানার পাশাপাশি অনলাইনেই ই-পাসপোর্ট আবেদন করতে পারবেন। নিচের ৫টি সহজ ধাপ অনুসরণ করে খুব সহজে সম্পন্ন করতে পারবেন এই আবেদন-প্রক্রিয়া:

ধাপ - ১:
প্রথমেই জেনে নিন আপনার জেলা কিংবা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে কি না। ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম শুরু হয়ে থাকলে অনলাইনে আবেদনের ক্ষেত্রে এই লিংকে https://epassport.gov.bd/onboarding ক্লিক করে আপনার বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী জেলা ও থানার নাম তালিকাভুক্ত করুন এবং বাংলাদেশের পাসপোর্ট অফিস অথবা দূতাবাসের তালিকা থেকে নির্দিষ্ট অফিস নির্বাচন করুন।


ধাপ - ২:
অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন ফরম পূরণ করুন এবং সময় বাঁচাতে অনলাইন পেমেন্ট অপশন নির্বাচন করুন। অনলাইন এবং পিডিএফ ফরম পূরণের মাধ্যমে ই-পাসপোর্ট আবেদন করা যায়। পিডিএফ আবেদন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পিডিএফ এডিটরের মাধ্যমে আবেদন ফরম পূরণ করে প্রিন্ট করে নিন। পূরণকৃত ফরম প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জাতীয় পরিচয় পত্র, পুরাতন পাসপোর্ট (যদি থাকে) সহ আপনার নির্বাচিত পাসপোর্ট অফিস কিংবা দূতাবাসে যোগাযোগ করুন। মনে রাখা জরুরী, হাতে লেখা কোন আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়, আবেদন ফরম অবশ্যই কম্পিউটারে পূরণ করতে হবে। আর বর্তমানে শুধুমাত্র অনলাইনেই আবেদন করা যায়।


ধাপ - ৩:
আপনার পাসপোর্টের ধরণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পাসপোর্ট ফি প্রদান করুন। পাসপোর্ট এপ্লিকেশনের প্রক্রিয়া শেষে নির্দিষ্ট ব্যাংকে কিংবা অনলাইনে ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ কিংবা অন্য নির্বাচিত মাধ্যমে পাসপোর্ট ফি প্রদান করা যাবে। ব্যাংকে পাসপোর্ট ফি পরিশোধ করতে গেলে পাসপোর্ট আবেদনপত্র সঙ্গে নিতে হবে।


ধাপ - ৪:
আবেদন ফরম পূরণ ও পাসপোর্ট ফি প্রদানের পর তালিকাভুক্তি এবং ছবি ও ফিঙ্গার প্রিন্টের তথ্য প্রদানের জন্য নির্বাচিত পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ করুন। ছবি ও ফিঙ্গার প্রিন্টের জন্য যাওয়ার সময় আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি, পাসপোর্ট ফি পেমেন্ট স্লিপ, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদ, পুরাতন পাসপোর্ট (যদি থাকে) এবং অন্যান্য সহায়ক কাগজপত্র সঙ্গে নিন। আপনার বর্তমানে ঠিকানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করুন। পাসপোর্ট অফিসে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়াদি যাচাই করা হয়।

  • কাগজপত্র ও ব্যক্তিগত তথ্য
  • আবেদনকারীর তোলা ছবি
  • আঙ্গুলের ছাপ ও আইরিশের ছবি গ্রহণ
  • পাসপোর্ট ফি পরিশোধের রিসিট

পাসপোর্ট অফিসে তালিকাভুক্তির পর সরবরাহকৃত ডেলিভারি স্লিপ/রশিদ নিরাপদে সংরক্ষণ করুন। পাসপোর্ট গ্রহণের সময় ডেলিভারি স্লিপ/রশিদ প্রর্দশন করা বাধ্যতামূলক।


ধাপ - ৫:
আবেদনকারীকে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে ডেলিভারি রশিদ ও পুরাতন পাসপোর্ট (যদি থাকে) দেখিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়। পাসপোর্ট প্রদানের সময় আবেদনকারীর ফিঙ্গারপ্রিন্টের সাথে এনরোলমেন্টের ফিঙ্গার প্রিন্টের মিল আছে কি না তা পরীক্ষণ করা হয়। তবে ১১ বছরের কম বয়সী শিশু, অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে উপযুক্ত বাহকের কাছে পাসপোর্ট প্রদান করা হয়ে থাকে।


ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে?

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্মনিবন্ধন সনদ (বিআরসি) অনুযায়ী ই-পাসপোর্টের আবেদনপত্র পূরণ করতে হবে। ১৮ বছরের কম বয়সী আবেদনকারী, যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই, তাদের পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।

ই-পাসপোর্ট এর মেয়াদ কতদিন?

ই-পাসপোর্ট পাওয়া যাবে ৫ বছর এবং ১০ বছর মেয়াদের। এছাড়া ৪৮ পৃষ্ঠার এবং ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট পাওয়া যাবে।

ই-পাসপোর্ট করতে কত খরচ হয়?

পাসপোর্টে পৃষ্ঠা সংখ্যার উপর ভিত্তি করে ৪৮ ও ৬৪ পৃষ্ঠা এই দুই ধরণের ই-পাসপোর্ট থাকছে। উভয় ধরণের পাসপোর্টে ডেলিভারি সময় অনুযায়ী আরও তিনটি ক্যাটাগরি রয়েছে। আর সে অনুয়ায়ী পাসপোর্টের ফি নির্ধারণেও রয়েছে ভিন্নতা।
৪৮ পেজের ই পাসপোর্ট ৫ বছরের মেয়াদ

  • ২১ দিনের মধ্যে রেগুলার ডেলিভারি ৪০২৫ টাকা
  • ১০ দিনের মধ্যে এক্সপ্রেস ডেলিভারি ৬৩২৫ টাকা
  • ২ দিনের মধ্যে সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারি ৮৬২৫ টাকা

৪৮ পেজের ই-পাসপোর্ট ১০ বছরের মেয়াদ

  • ২১ দিনের মধ্যে রেগুলার ডেলিভারি ৫৭৫০ টাকা
  • ১০ দিনের মধ্যে এক্সপ্রেস ডেলিভারি ৮০৫০ টাকা
  • ২ দিনের মধ্যে সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারি ১০৩৫০ টাকা

৬৪ পেজের ই-পাসপোর্ট ৫ বছরের মেয়াদ

  • ২১ দিনের মধ্যে রেগুলার ডেলিভারি ৬৩২৫ টাকা
  • ১০ দিনের মধ্যে এক্সপ্রেস ডেলিভারি ৮৬২৫ টাকা
  • ২ দিনের মধ্যে সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারি ১২,০৭৫ টাকা

৬৪ পেজের ই-পাসপোর্ট ১০ বছরের মেয়াদ

  • ২১ দিনের মধ্যে রেগুলার ডেলিভারি ৮০৫০ টাকা
  • ১০ দিনের মধ্যে এক্সপ্রেস ডেলিভারি ১০,৩৫০ টাকা
  • ২ দিনের মধ্যে সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারি ১৩,৮০০ টাকা
প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার