ইসলামী সনের নাম হলো হিজরি সন, আর হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররামুল হারাম। এই মাস অনেক ফজিলত ও বরকতের মাস, ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগেও এই মাসকে সম্মানিত মনে করা হতো। এই মাসের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে আরবরাও যুদ্ধবিগ্রহ মওকুফ রাখত। এতে বোঝা যায়, এর ইজ্জত, ইহতেরাম, সম্মান ও মর্যাদা বহু আগে থেকেই ছিল। হাদিস শরিফে এসেছে বছর হলো বারো মাসের সমষ্টি, তার মধ্যে চারটি অতি সম্মানিত তিনটি পরপর লাগোয়া জিলকদ, জিলহজ ও মহররম আর চতুর্থটি হলো রজব (বুখারি: ২৯৫৮)

আশুরার দিনের আমল : রাসূলুল্লাহ সা: আশুরার রোজা নিজে রেখেছেন ও উম্মতকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, অসংখ্য হাদিসে আশুরার রোজার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনÑ রাসূল সা: প্রথমে আশুরার দিনে রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পরে যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন যার ইচ্ছা আশুরার রোজা রাখত আর যার ইচ্ছা রাখত না (বুখারি: ৪/২৪৪, মুসলিম: ১১২৫)

হজরত আবু কাতাদা সূত্রে বর্ণিত রাসূল সা: বলেন, ‘আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (মুসলিম: ১১৬২, আবু দাউদ:২/৩২১)

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ‘আমি নবী করিম সা:-কে রোজা রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখেনি, যত আগ্রহী হতে দেখেছি এই আশুরার রোজা ও রমজান মাসের রোজার প্রতি’ (বুখারি: ৪/২৪৫, ২০০৬, মুসলিম: ১১৩২)। আশুরার আগে একদিন বা পরে একদিন রোজা রাখো’ (মুসনাদে আহমদ: ১/২৪১)

উল্লিখিত হাদিস ও অন্য হাদিসের আলোকে ফকিহরা বলেন, রোজা দুই দিন রাখা মোস্তাহাব ৯ ও ১০ তারিখ, তা না হলে ১০ ও ১১ তারিখ। কারণ, এ ক্ষেত্রে রাসূল সা:-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ইহুদিদের বিরুদ্ধাচরণ করা উচিত। তাই ফকিহরা আশুরার দিনেই শুধু একটা রোজা রাখাকে মাকরূহ বলেছেন।

আশুরার দিনে অন্য একটি আমল, হজরত আবু হুরাইরা রা: সূত্রে বর্ণিত, নবী সা: ইরশাদ করেন যে ব্যক্তি আশুরার দিনে আপন পরিবার-পরিজনের মধ্যে পর্যাপ্ত খানাপিনার ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ পাক পুরো বছর তার রিজিকে বরকত দান করবেন (তারাবানি: ৯৩০৩)। অতএব যদি কেউ উপরিউক্ত হাদিসের ওপর আমল করার উদ্দেশ্যে ওই দিন উন্নত খানাপিনার ব্যবস্থা করে তাহলে শরিয়তে নিষেধ নেই। তবে স্মরণ রাখতে হবে কোনোক্রমেই যেন তা বাড়াবাড়িতে ও সীমালঙ্ঘনের স্তরে না পৌঁছে।

বর্জনীয় কাজ : উপরোল্লিখিত আলোচনায় আমরা এ কথা বুঝতে পারলাম যে, আশুরার সম্মান, মর্যাদা ও ঐতিহ্য আবহমান কাল থেকে চলে আসছে। অনেকে না বুঝে অথবা ভ্রান্ত শিয়াদের প্ররোচনায় পড়ে বলে থাকেন যে, শুধু কারবালার ইতিহাসকে ঘিরেই আশুরার সব সম্মান মর্যাদা ও ঐতিহ্য। এতেই রয়েছে আশুরার সব রহস্য। তাই তারা আশুরাকে শোক প্রকাশের মাধ্যমেই পালন করে থাকেন। শুধু তাই নয় বরং ওই দিনে তারা বিভিন্ন কুসংস্কারে লিপ্ত হয়। তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল তাই আশুরার দিনে তাজিয়া করা, দুলদুল পতাকা, আহাজারি করা, মর্সিয়া, জারি, হজরত ইমাম হাসান ও হোসাইন রা:-এর কবর বানানো এবং নজর নিয়াজ রাখা, বুক চাপড়ানো ও হাই হাসান-হাই হোসাইন বলে বিলাপ করা এগুলো সব বিদআত ও কুসংস্কার।

তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, রাসূল সা:-এর প্রিয়তম দৌহিত্র জান্নাতের যুবকদের দলপতি হজরত হোসাইন রা:-এর শাহাদাত ও নবী পরিবারের কয়েকজন সম্মানিত সদস্যসহ প্রায় ৭২ জন কারবালার ময়দানে শাহাদাত বরণ করা তথা কারবালার ইতিহাস মুসলিম জাতির জন্য অতিশয় হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক। প্রতি বছর আশুরা আমাদের সেই মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এও বাস্তব যে, এ ঘটনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পেরে আজ অনেকেই শিয়াদের মতোই ভ্রষ্টতা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত। যারা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে ব্যথাভরা অন্তরে স্মরণ করে থাকেন, তারা কোনো দিনও চিন্তা করেছেন যে, কী কারণে হজরত হোসাইন রা: কারবালার ময়দানে অকাতরে নিজের মূল্যবান জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন? হজরত হোসাইন রা:-এর উদ্দেশ্য ও আদর্শ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করাই হবে এ ঘটনার সার্বিক মর্ম অনুধাবনের বহিঃপ্রকাশ।