আরেক দফা বেড়েছে কালুরঘাট সেতুর টোল, চরম অসন্তোষ

Img

৯০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কালুরঘাট সেতুর টোল আরেক দফা বেড়েছে। অহেতুক টোল বৃদ্ধির কারণে পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের ব্যয়ভার বাড়ায় চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বর্ধিত টোল প্রত্যাহারের দাবিতে ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছে সেতু পারাপাররত বিভিন্ন যানবাহনের শ্রমিক সংগঠন। সেতুর অতিরিক্ত টোল আদায়ের প্রতিবাদ জানিয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার (দক্ষিণাঞ্চল) সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক যৌথ কমিটি ও টেম্পু, ট্যাক্সি শ্রমিক ইউনিয়ন এবং যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক যৌথ কমিটির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ, যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মুছা ও সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিন চৌধুরী জানান, কোন ঘোষণা ছাড়াই বিভিন্ন যানবাহন থেকে জোরপূর্বক বাড়তি টোল আদায় করা হচ্ছে। এমনকি জোরপূর্বক দ্বিগুণ টোলও আদায় করা হয়। তারা অভিযোগ করে বলেন, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যেনতেনভাবে যানবাহন পারাপারের সুযোগ করে দেওয়ার ফলে কালুরঘাট সেতুতে প্রতিনিয়ত দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

এরফলে জরুরি প্রয়োজন, এমনকি রোগী পারাপারের এ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ইজারাদারের মর্জিমাফিক চলার কারণে নানা বিপত্তিতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে মানুষের শত শত শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এদিকে, মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতুর টোল একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তাদের দাবি, দেশের জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অনেক সেতু থেকে টোল আদায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

একইভাবে কালুরঘাট সেতুর টোল আদায়ও বন্ধ করে দেওয়া হোক। জানা যায়, গত রবিবার বিকেল থেকে কোনো ঘোষণা ছাড়াই কালুরঘাট সেতুতে পারাপাররত সকল ধরনের যানবাহন টোল বাড়িয়ে দেয়। বাড়তি টোলের কারণে যানবাহন পারাপার বন্ধ করে দিলে চরম দুর্ভোগে পড়েন হাজারো যাত্রী। টেম্পু-ট্যাক্সি শ্রমিক ইউনিয়ন যানবাহন বন্ধ করে ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। এরপর স্থানীয় সাংসদ, উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে টেম্পু ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হলেও ট্যাক্সি ভাড়া বাড়তি আদায় করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম অটো রিকশা, অটো টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশীদ বলেন, ট্যাক্সি থেকে ১৫ টাকার টোলের স্থলে ২০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। ৩১ মার্চের মধ্যে বর্ধিত টোল আদায় প্রত্যাহার করা না হলে শ্রমিক সমাবেশ ও ট্যাক্সি পারাপার বন্ধসহ ধর্মঘট ঘোষণা করা হবে। চট্টগ্রামের সঙ্গে বোয়ালখালীর যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ট্যাক্সি ও টেম্পু। এই দুই গণপরিবহন থেকে অযাচিতভাবে টোল বাড়ানো হলে হাজার হাজার যাত্রীদের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ে। টোল বৃদ্ধির পর পরিবহন ভাড়াও বাড়ানো হয়। বাড়তি ভাড়া গুনতে গিয়ে নিম্ন আয়ের লোকজন ও চাকরিজীবীদের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ে।

চট্টগ্রাম জেলা অটো টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের বোয়ালখালী শাখার সাধারণ সম্পাদক সেলিম উদ্দিন বলেন, টেম্পুতে গড়ে ১০ জন করে যাত্রী পারাপার হলে জনপ্রতি ৪ টাকা করে টোল পড়ে। সেই চার টাকা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও টেম্পু চালকদের সঙ্গে বাকবিতন্ডা ও ঝগড়া-বিবাদ লেগে রয়েছে। অতিরিক্ত টোল আদায় প্রত্যাহার করা না হলে টেম্পু পারাপার বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় থাকবে না। টোল বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে গতকাল উপজেলা সদরে স্থানীয় সাংসদ মঈনউদ্দিন খান বাদলের সঙ্গে টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তবে বৈঠকে টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কোনো প্রতিনিধি ছিল না। বিষয়টি সুরাহা করার জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেন। তা নিয়ে সন্তুষ্ট হননি টেম্পু চালকেরা। তারা বলেন, বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সাংসদ, উপজেলা প্রশাসন, টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সেতু ব্যবহারকারী যানবাহন সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৈঠক করা হলে এর সমাধান করা সহজ হত। এখন সমাধানের চেয়ে সমস্যাটি জিইয়ে রাখা হয়েছে। টেম্পু চালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম বলেন, এই বিষয়ে চালকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। চালকেরা বাড়তি টোল দিয়ে সেতু দিয়ে যানবাহন চালাতে রাজি হচ্ছে না।

একই দাবি ট্যাক্সি চালকদেরও। ৯০ বছরের পুরোনো মেয়াদোত্তীর্ণ- জরাজীর্ণ কালুরঘাট সেতুর অবকাঠানো নড়বড়ে হয়ে গেছে। ভারী ওজনের যানবাহন পারাপারের কারণে সেতু পিচ, পিস প্লেট ও রেলবিট ভেঙে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পুরো সেতুতে ছোট ছোট গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। চরম ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী সেতু পারাপার হচ্ছে। এতে সেতু পারাপার হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা দুর্ঘটনা লেগে রয়েছে। রেলের ধসে যাওয়া ভাঙা লাইনে ধাক্কা খেয়ে ট্যাক্সি টেম্পুর চাকা ও যন্ত্রাংশ প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়।

যানবাহন বিকলের কারণে দীর্ঘ যানজট নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেতুর নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থার কারণে যানবাহন বিকল হলে তার দায় গিয়ে পড়ে যানবাহনের ওপর। যানজটের কারণে টোল আদায় কমেছে অজুহাতে ওই গাড়ি থেকে জরিমানা হিসেবে অতিরিক্ত টোল আদায় করা হয় বলে অভিযোগ টেম্পু শ্রমিক সংগঠনের। টেম্পু সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, সেতুর ওপর গাড়ি আটকে গেলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। যানবাহন চালকদের ওপর নৈরাজ্য ও জুলুম করা হচ্ছে। এদিকে, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, কালুরঘাট সেতু থেকে টোল আদায় বন্ধ করে দেওয়া হোক।

দেশের বিভিন্ন স্থানে এই ধরনের জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু থেকে টোল আদায় করা হয় না। তিনি আরও বলেন, নতুন সেতু নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত টোল আদায় বন্ধ রাখতে হবে। না হয় যাত্রীদের নিয়ে কর্মসূচি দেওয়া হবে। গোমদণ্ডী ফুলতলী থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত টেম্পু ভাড়া ছিল ৬ টাকা। প্রায় এক দশকের ব্যবধানে ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে তা ১৫ টাকায় পৌঁছেছে। সন্ধ্যা হলে আবার ২০ টাকায় নেওয়া হয়। দফায় দফায় কালুরঘাট সেতুর টোল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি টেম্পু সংগঠনের নেতাদের। এভাবে দফায় দফায় টোল বাড়ানোর কারণে যাত্রীদের পকেট কাটা যাচ্ছে।

এলাকাবাসী জানায়, মেয়াদোত্তীর্ণ-জরাজীর্ণ কালুরঘাট সেতু দিয়ে ১০ টনের অধিক ওজনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে রেলওয়ে। কিন্তু ঘোষণা দিয়ে দায় সেরেছে। প্রতিদিন তার দ্বি-তিন গুণ ওজনের যানবাহন চলাচল চলে আসছে। এবিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই। তার ওপর বাড়তি টোল মারার ওপর খাঁড়ার ঘাতে পরিণত হয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মেয়াদোত্তীর্ণ একমুখীর সেতুর কারণে থমকে রয়েছে বোয়ালখালী তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়নের চাকা। দীর্ঘদিন ধরে একটি দ্বিমুখী নতুন সেতু নির্মাণের দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছেন দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার