১৯৯৫ সাল। আমাদের বেড়ে ওঠা অঁজপাড়া গায়ে। পত্রিকা নেই, সবার ঘ‌রে ঘ‌রে রেডিও নেই, টেলিভিশন নেই। ভরা বর্ষায় আমরা প্যাচপ্যাচে কাদা মাখা কাঁচা মাদ্রাসা মাঠ সেখা‌নে জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলি। সেই জাম্বুরা ফুটবলে আমরা একেকজন ম্যারাডোনা হ‌য়ে যায়। কিভাবে কিভাবে যেন ম্যারাডোনার নাম শুনেছিলাম। কেউ ভালো খেললেই আমরা হুটহাট তার নাম দিয়ে দেই ম্যারাডোনা।

এমনকি আমাদের বাড়ির পাশে জালাল কাকা, যে কিনা সেই জাম্বুরা ফুটবলেও ছিলো অসাধারণ গোল্লি।মা‌ঝে মা‌ঝে হ্যান্ড গ্লোবস হি‌সে‌বে হা‌তে থাক‌তো এক জোড়া স্যা‌ন্ডেল (আমরা তখনও জানতাম না গোলপোষ্টের নিচে যে থাকে তাকে গোলকিপার বলা হয়, আমরা গোলকিপারকে বলতাম গোল্লি)।

সেই জালাল কাকাও আমরা একটা ‘ম্যারাডোনা’ নাম দিয়ে দিলাম, তার নাম হলো- ‘গোল্লি ম্যারাডোনা’!!‌
আমরা সন্ধ্যা হলেই সেই জলছলছল ঘাসের মাঠ ছেড়ে উঠতে চাই না। ইশ। সূর্যটা আরেকটু পরে ডুবুক। মাগরিবের আজানটা দিয়েই দিল! যাহ! বাড়ি ফিরতে হবে? আমাদের বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা হয় না। মাদ্রাসা পেছনে বিশাল ব‌রিশাল তালই পুকুর, সেই পুকুরে আমরা টুপটুপ করে লাফিয়ে পড়ি। আমাদের শরীর ভর্তি ঘাস, নোংরা জল, কাদা। সেই ঘাস কাদা মাখা শরীর সাফ করতে গিয়ে তালপুকুরেই আমরা আরেকদফা খেলায় মেতে উঠি। তখন সন্ধ্যা আরও গাড় হয়ে উঠেছে। আমরা পরস্পরের মুখ দেখতে পাই না। কিন্তু অস্তিত্বগুলো টের পাই। কত কত মুখ। মুখ গুলো কেমন অবলীলায়, অদ্ভুত নির্লিপ্ততায় সেঁটে থাকে বুকের কোন অচিন কোনায়... এতো অবলীলায় যে আলাদা করে টের পাওয়ার যেন প্রয়োজনই পড়ে না।

আজকাল প্রায়ই সেই প্রশ্নগুলো আসে, প্রশ্ন গুলো এলো। সেই মানুষগুলো কই? সেই মাঠ? সেই ঘাস? সেই বৃষ্টির জল? সেই কাদা মাখা মুখ, তাল পুকুর, মাগরিবের আজান, অসহ্য সন্ধ্যা, কিংবা জাম্বুরা ফুটবল?
সেই মানুষগুলো?
আজ এক প্রবা‌সি বন্ধু ফোন দি‌ছে। কিছুক্ষণ আগে, 
 - দোস্ত, কেমন আছোস?!
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে, 'কত বছর পর তুই ফোন কর‌লি?
সে কথা বলে না। ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকে। অনেক্ষণ পর ফিসফিস করে বলে, 'খালি কান্দন আহে ভাই... বাড়ির কথা মনে পড়লে, হেই মাঠের কথা মনে পড়লে, আমাগো হে সবাইর কথা মনে পড়লে খালি কান্দন আহে... মনে হয় সব  ছুইরা চইল্যা যাই। তো‌গো কাছে যাই'।
আমি এবারও কিছু বলি না। ওর ফেসবুক ওয়ালে লিখি দিয়ে আসি, 'ওরে ভাইরে, পরানডা পোড়ে...'

সেই লেখা দেখে মনে মনে ভাবি, তোরা আসলেইতো আর সব আগের মতো হয়ে যাবে না রে বোকা! কিছুইতো আর সেই আগের মত নেইরে! কিচ্ছু সেই আগের মতো নেই। সেই মানুষগুলোও না। সেই ফানুসগুলোও না। সব বদলে গেছে। তারচেয়ে বুকের ভেতর সেই আগের ফ্রেম, ফ্রেমের মানুষ আর অনুভূতিগুলোই শুধু যত্ন করে আগলে রাখিস। কান্না পেলে কাঁদিস। পৃথিবীর সকল প্রিয় কিছুর জন্যই ঈশ্বর আমাদের কান্না দিয়েছেন। সময়, সেই প্রিয়তম জিনিসের একটি, কান্নাটা থাকুক না হয় তার জন্য..