আপনি এই ভয়ানক রোগে আক্রান্ত নন তো?

Img

মুড সুইং, ডিপ্রেশন, স্ট্রেস - ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায় সবাই এই শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচিত। অফিসে কাজ করতে করতে হঠাৎ বিরক্ত লাগছে, কাজ করতে মন চাইছে না, মনে হচ্ছে যেন কোথাও চলে যাই, আবার কখনও একটুতেই আনন্দে উৎফুল্ল হচ্ছে মন। বদলে যাওয়া এই মানসিক অবস্থাগুলোকে সাধারণত আমরা অতটা গুরুত্ব দিই না, ভাবি কাজের অত্যাধিক চাপে হয়তো এরকম হচ্ছে। কিন্তু সতর্ক হন, আপনার মানসিক বদল কিন্তু ভয়াবহ রোগের কারণ হতে পারে!

মনোবিদরা বলছেন, মানসিক অবস্থার পরিবর্তন আসলে গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ। চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে বলে 'বাইপোলার ডিসঅর্ডার'। গোটা বিশ্বে যে হারে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা তাতে রীতিমতো চিন্তিত মনোবিদরা। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২০১৭ সালে প্রায় ৭৯২ কোটি মানুষ এই মানসিক রোগের শিকার। যার মানে বিশ্বে প্রতি ১০ জনের এক জন করে এই ভয়ঙ্কর ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাহলে আসুন জেনে নেওয়া যাক কী এই বাইপোলার ডিসঅর্ডার।

বাইপোলার ডিসঅর্ডার কী ?

বাইপোলার ডিসঅর্ডার, ম্যানিক ডিপ্রেশন নামে পরিচিত। মানসিক এই রোগের কারণে মুডের পরিবর্তন হয়। ঘুমোনো, ভাবনা-চিন্তা, আচরণে বদল ঘটে। এই রোগে আক্রান্তরা কখনও খুব আনন্দিত হয়ে পড়েন কখনও আবার ভীষণ দুঃখ ঘিরে ধরে তাঁদের। এই দুই অবস্থার একটি হল ডিপ্রেশন, অন্যটি হল ম্যানিক স্টেজ। মাঝের সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তি থাকেন একদম নর্মাল, বাকি মানুষদের মতো। কখনও বেশি চিন্তা কখনও কম, মুডের এই দুই অবস্থাকেই বলে বাইপোলার ডিসঅর্ডার। মুডের একটি অবস্থায় রোগী উত্তেজিত হয়ে পড়েন, আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় অবস্থান করেন আর মুডের অন্য অবস্থায় রোগী প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে যান, বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্তরা কল্পনার জগতে বিচরণ করেন। তাঁরা এমন জিনিস সম্পর্কে কথা বলেন যেটা বাস্তবে নেই। অনেক সময় তাঁরা এমন জিনিস নিজেদের আশপাশে দেখেন বা শুনতে পান যেগুলোর বাস্তবে কোনও উপস্থিতি নেই।

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের প্রকার

বাইপোলার ১ ডিসঅর্ডার

এই স্টেজে চূড়ান্ত ভুল আচরণ করেন আক্রান্ত ব্যক্তি। প্রায় দু'সপ্তাহ ধরে মুডের পরিবর্তন হয়। ভালো না লাগা ও ভালো লাগা, মুডের দুই অবস্থাই দেখা যায় রোগীর মধ্যে।

বাইপোলার ২ ডিসঅর্ডার

বাইপোলার ২-এর লক্ষণ বাইপোলার ১-এর মতোই। তবে বাইপোলার ২-এ রোগীর অবস্থা বাইপোলার ১-এর মতো অতিরিক্ত হয় না।

সাইক্লোথিমিক ডিসঅর্ডার

এই ধরণের মানসিক অবস্থা দুই বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বড়দের মধ্যে, শিশু ও টিনএজারদের মধ্যে ১ বছর পর্যন্ত। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের দুটি স্টেজের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয় সাইক্লোথিমিক ডিসঅর্ডার। ম্যানিক এবং হতাশাজনক আচরণ দেখা যায় আক্রান্তের মধ্যে।

রোগের লক্ষণ

ডিপ্রেশন মানেই মন খারাপ। এই স্টেজে কোনও কিছুই ভালো লাগে না। কখনও মন খারাপ, এমনি এমনি কান্না এসে যায়, আবার কখনও বসে থাকতে থাকতে হাসি পায়। অনেক সময় খিদে, ঘুম পায় বেশি আবার মানসিক অবস্থার অন্য স্টেজে দুটোই উড়ে যায়। মূলত ম্যানিক স্টেজে মন আনন্দে ভরে ওঠে। নতুন নতুন ভাবনা ভিড় করে মাথার মধ্যে। কাজ করার এনার্জি হঠাৎ করে কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

ম্যানিয়া-র লক্ষণগুলো হল

  • অতিরিক্ত আনন্দ, উচ্ছাস, আশাবাদী
  • আনন্দ থেকে হঠাৎ রেগে যাওয়া
  • অস্থিরতা
  • তাড়াতাড়ি কথা বলা
  • এনার্জি বেশি, ঘুম কম
  • যৌন ইচ্ছা বেড়ে যাওয়া
  • ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া
  • মাদক ও মদের নেশা
  • আবেগপ্রবণতা
  • খিদে কমে যাওয়া
  • সহজেই বিভ্রান্ত হওয়া
  • অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস


ডিপ্রেশন-এর লক্ষণগুলো হল

  • দুঃখ, এনার্জির অভাব
  • নিরাশা
  • নিজেকে অযোগ্য মনে করা
  • ভালোলাগাগুলো বদলে যাওয়া
  • ভুলে যাওয়া
  • ধীরে ধীরে কথা বলা
  • যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া
  • হঠাৎ হঠাৎ কান্না পাওয়া
  • অতিরিক্ত ঘুম
  • সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা
  • আত্মহত্যা বা মৃত্যুর কথা চিন্তা করা
  • আত্মহত্যার চেষ্টা

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের কারণ

১) গবেষকরদের মতে, অনেকের ক্ষেত্রে জেনেটিক্স হতে পারে যার মানে পরিবার সূত্রে রোগটি এসেছে। অনেকসময় কৈশোরকালে বাইপোলার ডিসঅর্ডার দেখা যায়। সেইসময় এর সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় অনেকেই লুকিয়ে যায় বিষয়টি।

২) হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, মর্মান্তিক কোনও ঘটনার কারণে চরম আঘাত, অত্যাধিক ড্রাগ নেওয়ার কারণেও বাইপোলার ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে।

৩) তীব্র হতাশা থেকেও হতে পারে এই রোগ।

রোগের ঝুঁকি

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সব বয়সের মানুষ এই মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। কৈশোর বা যৌবনকালের শুরুতে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। তবে পুরুষদের থেকে মহিলারা এই রোগে আক্রান্ত হন বেশি।

রোগ নির্ণয়

১) প্রথমে পরিচিত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁরা বিভিন্ন প্রশ্ন করে জানার চেষ্টা করবেন আপনার মানসিক রোগ কোন পর্যায়ে আছে। এই রোগ প্রভাব ফেলতে পারে আক্রান্তের পরিবারে। তাই প্রথম থেকেই সতর্ক হওয়া খুব দরকার।

২) অন্য কোনও রোগ, যেমন - থাইরয়েড, অতিরিক্ত মদ ও মাদকদ্রব্য সেবনের কারণেও বাইপোলার ডিসঅর্ডার হতে পারে। তাই কতদিন ধরে মানুষটি আক্রান্ত, তার কী কী সমস্যা হচ্ছে সেগুলো চিকিৎসকের জানা জরুরি।

৩) শিশুর মধ্যে হঠাৎ করে অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। রোগ ফেলে রাখলে মারাত্মক হতে পারে।


চিকিৎসা

১) অন্যান্য রোগের মতো এরও চিকিৎসা রয়েছে। তবে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি।

২) এই রোগের মূল চিকিৎসা মেডিটেশন। বিভিন্নভাবে মুডকে স্থিতিশীল করা হয় মেডিটেশনের মাধ্যমে।

৩) এই রোগের ক্ষেত্রে সাইকিয়াট্রিস্টরা অ্যান্টি-ডিপ্রেশান্ট দেন। অনেক সময়ে মুড স্টেবিলাইজারও দেওয়া হয়। ঘুম যাতে ভাল হয় তার জন্য ঘুমের ওষুধও দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। কাউন্সেলিংও করানো হয় রোগীর।

৪) রোগীর সঙ্গে কথা বলেও তাঁকে রোগমুক্ত করার চেষ্টা করেন মনোবিদরা।

৫) এছাড়া Interpersonal and social rhythm therapy, Cognitive behavioral therapy রয়েছে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায়।

৬) বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির তার পরিবারের সাপোর্ট ও ভালোবাসা খুব দরকার।

৭) এছাড়া জীবনযাত্রার পরিবর্তন জরুরি। যেমন প্রতিদিন এক্সারসাইজ, খাওয়াদাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম দরকার রোগ থেকে সেরে ওঠার জন্য। ভালো অভ্যাস, খেলাধূলা, মাদক থেকে দূরে থাকা দরকার।

বাইপোলার ডিসঅর্ডার একপ্রকার মানসিক রোগ। যেকোনও মানুষই আক্রান্ত হতে পারেন। এতে লজ্জা বা ভয়ের কিছু নেই। নিজে বা কাছের কেউ বাইপোলার ডিসর্ডারের শিকার বুঝতে পারলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তাহলেই অন্য রোগের মতো এর থেকেও মুক্তি সম্ভব।

- সূত্র: বোল্ডস্কাই
প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার