ঢাকার সেই কবি খুব দুখি মানুষ। বেঁচে থাকবার ইচ্ছেটা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। বুকের মধ্যে এত অভিমান,  এত দুঃখ। কিন্তু তিনি মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারেননা তাঁর  না বলা দুঃখের কথাগুলি। বিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের একান্ত অনুরাগী এই কবি। স্বাধীনতার চেতনায়  উজ্জীবিত দ্বিতীয় এক সুকান্ত যেনো। 

বেঁচে থাকব কেন?  কি মিশন নিয়ে  বাচবেন কবি?তার  লেখাগুলো বিরোধী দলের লোক বেশী পসন্দ করে, তাই বেশী এগুতে চাইলে  গ্রেফতার নিশ্চিত। উন্নত আয়ের জন্য   বিদেশে যাবার মতো টাকা নেই। 

কী লাভ এভাবে বেঁচে থেকে? এই প্রশ্ন তাঁর মনে অাসছে। কিন্তু তিনি উত্তর খুঁজে পাচ্ছেননা। মরে গিয়েই বা লাভ কী? কবি  নিজেকে প্রশ্ন করেন। লাভ কিছু নেই। কিন্তু জীবন যেমন অনেক মানুষকে টানে, তেমনি মৃত্যু কখনও কখনও কাউকে তীব্র ভাবে  টানতে থাকে।

ঢাকার মগবাজারে  একটি ছোট ঘরে তিনি ভাড়া থাকছেন কিছুদিন হলো।  হিন্দু হলেও দেশের স্বাধীনতা নিয়ে  তিনি চিন্তিত।গয়েশ্বর চন্দ্র  রায়ের সাথে কিছুদিন ধানের শীষের পলিটিক্স করেতেন।তাঁর এই ছোট ঘরটিতে ইদানিং   সন্ধেবেলা মৃত্যু এসে তাঁর  পাশে যেন শুয়ে পড়ে। তাঁকে মৃত্যু তখন ডেকে বলে এসো কুয়াশার স্রোতে ভেসে  অামার কাছে।  যে ডাক তিনি তাঁর প্রেমিকার কাছ থেকে শুনতে চেয়েছিলেন, স্ত্রী অনিতার কাছ থেকে শুনতে চেয়েছিলেন সেই গভীর মমতাময় স্বরে মৃত্যু যেন তাঁকে ডাকে। 

তাঁর মাথার মধ্যে বুকের মধ্যে যেন নক্ষত্ররা ঝরে পড়ে। তাঁকে চলে যেতে হবে।  গ্রাম ও ঢাকার কবি বন্ধুদের  ছেড়ে। কবি নজরুলের কবরের  কাছাকাছি গাছের তলায় একাকী বসে আত্মহত্যার কথা ভাবছেন,   গাছের কয়েকটা পাতা খসে পড়ে তাঁর মাথায়। এই গাছটাকে তাঁর ছোটবেলার বন্ধু মনেহয়, পরক্ষণে গাছটাকে নিজের মেয়ে বলে মনেহয়। কবির আজ মাথা ঠিক নেই। তাঁর তেমন কোনও রোজগার নেই বহুদিন।  বউ রাতে  সেজেগুজে  নায়িকা হতে চলে যায়। এনজিওর  চাকরি থেকে তাঁকে তাড়ানো হয়েছে নানা রকম পলিটিক্স করে। হিন্দু হলেও  বিএনপি করা যাবেনা।

রোজগার থেকে তাঁকে সরালে হয়তো ফুরিয়ে যাবে তাঁর কবিতা লেখার দম এই অাশায় অনেক সরকার পন্থী  কবি বুক বেধেঁছিলেন। 

 দেশে একযুগ ধরে  ভোট নাই, প্রশাসনে বিদেশি লোক?
কি নিয়ে লিখে  দেশ জনতাকে জাগাবেন তিনি ?  স্বাধীনতা,  ভোট, গনতন্ত্রকামী জনতার ওপর নির্যাতন, বিদেশি শকুনির থাবা, এসব সত্য বিষয়ে  লিখলে বিপদ। লুটপাট, করাপশন নিয়ে লিখলে বিপদ। চাকরি?  অত্যাচার, কথায় কথায় ঘুষ চাওয়া অার সইতে পারলেননা তিনি।  ইনসিওরেন্সের এজেন্ট হয়ে কাস্টমার সাড়া মেলেনি।  জীবনের এমন অনেক কিছু দেখলেন যাতে তাঁর মনে হলো তিনি এই মঘের মুল্লুকে বাঁচবেননা। মরে  ভোরের কুয়াশা হয়ে যাবেন। 

 তার ভার্সিটি  পড়ুয়া স্ত্রী  নায়িকা হতে না পেরে  এখন সরকারি দলের ছাত্রীদর নেত্রী।  মধ্যরাতে কখনো বাসায় ফিরে কখনো উন্নত হোটেলের গণিকা। কবির  কবিতা, সাহিত্যের কোন দাম নাই স্ত্রীর কাছে।   একদিন ক'জন ছাত্র নেতা নিয়ে রাতে বাসায় হাজির। কবিকে তার স্ত্রীর সরকারি বয় ফ্রেন্ডরা হোটেল থেকে ডিনার কিনে আনতে টাকা দেয়। এবং বলে একটু দেরি করে এসো,  বনেদি কাস্টমার এনেছি। কী অপরূপ লাগে তখন ক্লান্ত স্ত্রীকে।তার স্ত্রীর মুখে সফল পতিতার হাসি ফুটে  ওঠে। স্বামীর সামনেই ওদের জন্য সাজুগুজু করে এবং  কর্কশ স্বরে  বলে উঠল, দূর হ, বেরিয়ে যা এখান থেকে। পুরুষ মানুষ? থুঃ, একটা পয়সা রোজগারের  মুরোদ নেই। বউকে গিলে খাচ্ছে পাড়ার মস্তানরা,রাজনৈতিক নেতারা,  সামলানোর মুরোদ নেই। শুধু কবিতা লিখছে। একটা লোক চেনেনা। একটা পয়সা অাসেনা ঘরে তবু কবিতা লিখছে। বেরিয়ে যা। তুই মরলে  একটা পেট ঘাড় থেকে নামবে।

 অনিতার চরিত্র সীমা এতো নিচ? সেদিন পুরুষ নিরযাতনের সভায় কবি নিশ্চুপ ছিলেন,  আজ  কুয়াশার স্রোতে ভেসে মিলিয়ে যাবার ইচ্ছে ছাড়া অার কিছুতে এখন মন লাগেনা কবির। সক্রিয়ভাবে সরকারি দল করেননা বলে 
ঢাকা শহরের এই ছোট্ট কবিকে তেমন কেউ চেনেনা। অথচ তার অনেক জুনিয়র বুদ্ধিজীবী সরকারের মধুমক্ষি সেজে টকশো করেছে টিভিতে। তার যোগ্যতার কদর নিজ দেশেই পেলোনা,আপসোস কবির।

তাঁর কবিতা নিয়ে একটা লাইন লেখেনা কেউ-ই। বেশিরভাগ  সাহিত্য আড্ডায়  তাঁকে ডাকা হয়না। প্রভাবশালী কবিরা প্রায় প্রত্যেকে সম্মিলিত ভাবে মুছে দিতে চান তাঁর কবিতার পংক্তিগুলিকে।

নাগরিক জীবনের এই অবহেলা, সমাজ সংসার ও রাষ্ট্রের জুলুমের দৃশ্য, নৈরাজ্য দেখে কবি আত্মহত্যার পথ বেচে নেন।

যমদুত যেন  তাঁর পাশে বসে তাঁকে ডেকে বলে,  এসো..... ওই দূরে নক্ষত্রের অালোর কাছাকাছি এসো

কবি ফার্মগেট থেকে ছুটে আসা বাসের সামনে  ঝাপ দিতেই পিষে দিল তাঁর পাঁজর। চাকায় দলা পাকিয়ে গেল তাঁর পা। মড়মড় করে ভেঙে গেল কন্ঠা অার উরুর হাড়। হৈ হৈ করে ছুটে এল লোকজন।  শাহবাগের রাজপথ ভেসে গেল রক্তধারায়। রাস্তায় লেগে রইল জমাট রক্তদাগ আর দেশ সমাজ থেকে প্রতারিত উদীয়মান কবি ও বুদ্ধিজীবীর নিথর দেহ। ভার্সিটির স্টুডেন্ট লিডাদের জন্য ইয়াবা আর ডিনার নিয়ে বাসায় ফেরা হলোনা।