অতি আদিম যুগে মানুষের সংগ্রাম ছিল শুধু খাদ্যের। আজ কালের বিবর্তনে মানুষ যুদ্ধ করছে ভালো থাকার জন্য। দিন যায় বৃদ্ধি পায় মানুষের চাহিদা। আর এই চাহিদা পূরণে আমাদের মত উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত অথবা দরিদ্র দেশের মানুষ হচ্ছে অভিবাসী। অভিবাসী হতে কেউ বেছে নিচ্ছে বৈধ পথ আবার কেউ  বেছে নিচ্ছে অবৈধ পথ। আজ আমার আলোচনার বিষয় অবৈধ অভিবাসী অর্থাৎ মানুষ কিভাবে নিজ রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে অবৈধ অভিবাসী হচ্ছে।

অবৈধ অভিবাসী নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমাদের জানা প্রয়োজন কেন একটি দেশের নাগরিক অভিবাসনের পথ বেছে নেয়। একটি ছোট গবেষণায় জানা যায় যদি কোন দেশে কর্মসংস্থানের অভাব থাকে কিংবা পরিশ্রম অনুযায়ী পারিশ্রমিক না পাওয়া যায় অথবা জীবন যাত্রার মান নিম্ন হয় এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে সে ক্ষেত্রে একটি দেশের নাগরিক অভিবাসনের পথ বেছে নেয়। কেউ বৈধ পথে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে, কেউ যাচ্ছে অবৈধ পথে আবার কেউ বৈধপথে গিয়েও পরবর্তীতে অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ হয়ে যাবার কারণগুলো নিয়েই আজ আমরা আলোচনা করব। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার অবৈধ শ্রমিকদের নিয়ে আজ আলোচনার বিষয়।

আমি আগেই বলেছি যে কোন দেশের নাগরিক অন্য দেশে বৈধ বা অবৈধ পথে প্রবেশ করতে পারে আবার কেউ বৈধ থেকেও অবৈধ হয়ে যায়। এবার আমরা মূল আলোচনায় আসি মালয়েশিয়াতে অনেক শ্রমিকেরা অধিক উপার্জনের আশায় সরাসরি কোম্পানিতে না এসে এজেন্টের মাধ্যমে ভিসা করিয়ে চলে আসে। পরবর্তীতে এই অধিক উপার্জনের আশাটাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। যদি শ্রমিকেরা ভালো বা বিশ্বাস যোগ্য এজেন্টের হাতে না পরে সেক্ষেত্রে সেইসব শ্রমিকই অবৈধ হয়ে যায়। আবার অনেক সময় অবৈধ শ্রমিকরা বৈধ হওয়ার জন্য এজেন্টের কাছে টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়। অতি সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটেছে বহু।

দ্বিতীয়তঃ অবৈধ হওয়ার আরেক কারণ নিয়োগকর্তা নিজেই। অনেক সময় অনেক নিয়োগকর্তা আছে যারা শ্রমিকদের সঠিক পারিশ্রমিক দিতে চায় না বা যে কথা বলে শ্রমিকদের নিয়োগ দেয় সে পরিমাণ বেতন বা পারিশ্রমিক নিয়োগকর্তা দেয় না। যার ফলে একজন শ্রমিক অবৈধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়। 

উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায় যেমনঃ বাংলাদেশ থেকে আসার পূর্বে একজন শ্রমিককে জানানো হলো যে তার বেসিক হবে ১ হাজার রিঙ্গিত, ওভারটাইম ৭.৯০ রিংগিত প্রতি ঘন্টা এবং প্রতিদিন ওভারটাইম হবে ৫ ঘন্টা অর্থাৎ প্রতিদিন এ ওভারটাইম থেকে আসবে ৩৯.৫০ রিংগিত, আর রবিবার বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করলে ১০ রিংগিত ঘন্টা ধরে দৈনিক আসবে ৮০ রিঙ্গিত এবং মাসে আসবে অতিরিক্ত ৩২০ রিঙ্গিত। অর্থাৎ সবমিলিয়ে একজন শ্রমিকের প্রতি মাসে পারিশ্রমিক আসবে ২৩৪৭ রিংগিত  বা প্রায় ২৫ শত রিংগিত যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫০ হাজারেরও উপরে। আর বাস্তব চিত্র একজন শ্রমিকের প্রতি মাসের বেতন হবে ১ হাজার থেকে ১২ শত রিঙ্গিত যা বাংলাদেশী টাকায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। এসব শ্রমিকই পরবর্তীতে আরো বেশি আয়ের আশায় অবৈধ হয়ে যায়।

আবার কখনো কখনো নিজ দেশের মানব সম্পদ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কারণেও অনেক শ্রমিক অবৈধ হয়। যেমন একজন শ্রমিক যদি ৩.৫০ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকায় মালয়েশিয়া আসে এবং ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতন পায়। তাহলে সেই সব শ্রমিক অবৈধ হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

অনেক সময় দেখা যায় আধা শিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত কিংবা একেবারেই পড়ালেখা না জানা লোক গুলো অনেকের সাথে পারস্পারিক যোগাযোগ ক্ষমতা কম থাকার কারণে অবৈধ হয়ে যায়। যেমন এসব শ্রমিকরা সবার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে পারে না। তাই তারা বর্তমান কাজ ছেরে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের কাছে চলে যায়। ফলাফল হলো এইসব শ্রমিকরা সেই দিন থেকেই অবৈধ।

মানুষ বিদেশে আসার পূর্বে এটার একটা রঙিন ছবি মনে মনে আঁকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাদের স্বপ্নের ছবির সাথে বাস্তবের কোন মিল থাকেনা। তাই অনেক সময় হোস্টেল বা থাকার জায়গা বা কোম্পানি কিংবা মালিক ভালো না হওয়ার কারণে এসব শ্রমিক অবৈধ হতে পারে।

নিজ দেশ ছেড়ে শ্রমিকরা যখন বিদেশে পাড়ি জমায় তখন শ্রমিকদের বসবাসরত রাষ্ট্রে অবস্থিত  নিজ রাষ্ট্রের বা দেশের দূতাবাস তাদের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে। বিপত্তিটা ঘটে তখন যখন একজন শ্রমিক ন্যায্য পাওনা বা তার নিয়োগকর্তা থেকে পায় না পাওয়া বা চিকিৎসা ভাতা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না পায় আর তা দূতাবাসকে জানালেও কোন সমাধান পাওয়া যায় না ঠিক তখনই একজন শ্রমিক অবৈধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সত্যি কথা বলতে কি, অনেক সময় একজন অবৈধ শ্রমিক বৈধ হতে চাইলেও ভিসা পেতে দেরি হওয়ার কারণে অনেকেই অবৈধ থেকে যায়।

দীর্ঘ সময় ধরে কাজ না করার অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে হঠাৎ করেই ১২-১৪ ঘন্টা টানা ডিউটি হওয়ার ফলে অনেক শ্রমিক অবৈধ হয়ে যায়। আবার বিপরীত চিত্র দেখা যায় যেমন ওভারটাইম কম থাকা বা ওভারটাইম না থাকার কারণেও অনেক শ্রমিক অবৈধ হয়। অন্যদিকে দেখা যায় কোন কোন শ্রমিক দীর্ঘদিন কাজ করে দক্ষতা অর্জন করার পরেও বেতন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির না হওয়ার কারণে অনেক শ্রমিক অবৈধ হয়।

বৈধ থাকার বিষয়টা হচ্ছে মুক্ত পাখির মত অন্যদিকে অবৈধ থাকাটা অনেকটা জেলখানায় বন্দি থাকার ন্যায়। সুতরাং প্রত্যেকটি শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তার জন্য বৈধ থাকা প্রয়োজন। আবার শ্রমিকের যে সকল সমস্যা আছে তা সমাধান কল্পে উভয় রাষ্ট্রেরই কাজ করা জরুরি। আর যে সকল শ্রমিকরা অবৈধ আছে তাদের বৈধ করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেই অবৈধ শ্রমিকের সংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।