বর্তমান বিশ্বে সেলফোন কিংবা ইন্টারনেট আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এগুলো ছাড়া যেন জীবন অচল। দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে প্রিয়জন কিংবা পরিচিতজনের সাথে অতি সহজে সেলফোনের মাধ্যমে কথা বলতে পারি।

এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সাথে সহজে কথা বলতে পারি। এটি তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর আবিষ্কার। আমাদের দেশে সেলফোন ব্যবহার করেন না তাদের সংখ্যা খুবই কম।

কিন্তু দুঃখজনক হলো, বেশ কিছু দিন আগে সেলফোন কোম্পানিগুলো কলরেট বাড়িয়ে দিয়েছে। যেখানে উন্নত বিশ্বে সেলফোনের কলরেট দিন দিন ব্যবহারকারীর নাগালের মধ্যে আনা হচ্ছে; সেখানে আমাদের দেশে কেন সেলফোন কোম্পানিগুলো কলরেট বাড়াল, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

যেখানে বছর শেষে সেলফোন কোম্পানিগুলোর লাভ হাজার কোটি টাকা; সেখানে কলরেট বাড়ানোর কারণ কী আমাদের জানা নেই। সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে সেলফোনের কলরেট কমানোর পদক্ষেপ নেয়া অতি জরুরি।

এদিকে, ইন্টারনেট আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে। এটি ছাড়া যেন আমাদের এক দিনও চলে না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খবর আমরা অতি সহজে জানতে পারি ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ইন্টারনেট আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবহার করে থাকি। কেউবা কম্পিউটারের মাধ্যমে, কেউবা সেলফোনে। কম্পিউটারে ব্যবহার করতে হলে বিভিন্ন ব্যান্ডউইথড কোম্পানি থেকে সংযোগ নিতে হয়। আবার সেলফোন থেকে ব্যবহার করতে ওই সব কোম্পানির কাছ থেকে ডাটা কিনে ব্যবহার করতে হয়।

প্রতি গিগাবাইট ইন্টারনেট ডাটা কিনতে সেলফোন অপারেটরদের ব্যয় হয় গড়ে ২৬ পয়সা। অথচ গ্রাহকের কাছে একই পরিমাণ ডাটা ২০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি করছে বেশির ভাগ অপারেটর। এতে ব্যান্ডউইডথের দাম দফায় দফায় কমানো হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না গ্রাহক। যদিও অপারেটরদের দাবি, ব্যান্ডউইডথের যে দাম তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে নেন, তা তাদের ডাটাভিত্তিক সেবার মোট ব্যয়ের ১-৩ শতাংশের বেশি নয়।

সেলফোন অপারেটররা ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) থেকে প্রতি মেগাবিটস প্রতি সেকেন্ড (এমবিপিএস) ব্যান্ডউইডথ কিনছে ৩৯০ থেকে ৫৫০ টাকায়। এক এমবিপিএস গতির সংযোগে মাস শেষে ডাটা ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫৯২ গিগাবাইট (জিবি)।

এ হিসাবে প্রতি জিবি ডাটা কিনতে অপারেটরদের ব্যয় হয় ১৫-২১ পয়সা। তবে সংযোগ বিচ্ছিন্নতাসহ অন্যান্য খাতে ৩০ শতাংশ অপচয় সমন্বয় করা হলেও তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৮১৪ জিবি। এতে প্রতি জিবি ডাটা কিনতে অপারেটরদের ব্যয় হয় সর্বনিম্ন ২২ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৩০ পয়সা, দুটোর গড় করলে দাঁড়ায় ২৬ পয়সা।

ফ্লেক্সিপ্ল্যানে সেলফোন অপারেটরদের ডাটাভিত্তিক সেবার তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রামীণফোনের ১ জিবি ডাটার সরাসরি কোনো প্যাকেজ নেই। ৩০ দিন মেয়াদে ৫০০ এমবি ডাটা কিনতে গ্রামীণফোনের গ্রাহকের ব্যয় ১৩৪ টাকা ২২ পয়সা। ১ জিবি ডাটা কিনতে বাংলালিংকের গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে ২০৯ টাকা। রবি ও এয়ারটেলের ১ জিবি ডাটা প্যাকেজের মূল্য যথাক্রমে ২১৩ টাকা ৬ পয়সা ও ২০৯ টাকা। তবে এ ক্ষেত্রে মেয়াদ ধরা হয়েছে ২৮ দিন। রাষ্ট্রায়ত্ত সেলফোন অপারেটর টেলিটকের ১ জিবি ডাটা প্যাকেজের মূল্য ৩০ দিন মেয়াদি ১৮০ টাকা। তবে গড় হিসাবে পাঁচটি অপারেটরের প্রতি জিবি ডাটার বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ২১৭ টাকা।

কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, নতুন সিম কিনলে গ্রাহকদের নানা সুবিধা দেয়া হয়। কিন্তু পুরনো ব্যবহারকারীরা এর থেকে বঞ্চিত থাকেন। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কেন এই দ্বিমুখী আচরণ? দেশে ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণে কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে ব্যান্ডউইডথের দাম কমিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ওয়াইম্যাক্স ও ফোর-জির মতো তারবিহীন উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়েছে। ফলে গ্রাহকও বেড়েছে। ইন্টারনেট গ্রাহকের বেশির ভাগই সেলফোন অপারেটরদের ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছেন।

ফোর-জি প্রযুক্তি চালু অপারেটরদের ডাটাভিত্তিক সেবা আরো সম্প্রসারণের সুযোগ এনে দেয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপারেটররা ব্যবসায় করলেও বঞ্চিত হচ্ছে গ্রাহক। এর থেকে উত্তরণের কোনো কী পথ নেই? অনেক গ্রাহকের ইন্টারনেট কিংবা সেলফোনের প্রতি আসক্তিকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর মুনাফালোভী দিনের পর দিন তাদের আখের গোছাচ্ছে। রাতারাতি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে।

আমরা বলছি না যে, তারা লাভ করবেন না, কিন্তু এর একটি সীমা থাকা অতি প্রয়োজন। যাতে সাধারণ গ্রাহকের সামর্থ্যরে মধ্যে থাকে। সরকারের দায়িত্বশীলদের এ বিষয়ে দৃষ্টি দেয়ার সময় এসেছে।