প্রচ্ছদ | সম্পাদকীয় | প্রবাসে আমরা বাংলাদেশিরা, পর্ব -১

প্রবাসে আমরা বাংলাদেশিরা, পর্ব -১

image

প্রবাস জীবনের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার এই লেখাটা পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।

দেখতে দেখতে প্রায় ৫ টি বছর প্রবাসে অতিবাহিত হলো। আমি বর্তমানে মালয়েশিয়াতে আছি। বিভিন্ন কারণে মালয়েশিয়ার অনেক জায়গাতে আমার যাতায়াত হয়েছে এবং সেই সুবাদে অনেকের সাথে জানাশুনা এবং পরিচয় হয়েছে। খুব কাছে থেকে আমি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাপন দেখেছি, দেখেছি তাদের জীবন যুদ্ধ। আরো একটি কারনে প্রবাসীদের সাথে আমার সম্পর্কটা নিবিড় আর তা হলো আপনাদের অতি পরিচিত এবং পছন্দের প্রবাসী অনলাইন সংবাদপত্র প্রবাসীর দিগন্তের প্রধান সম্পাদক হওয়ার সুবাদে প্রবাসীদের জীবনযাত্রা, চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনা সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। আর আমার সেই সব অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন থেকে ধারাবাহিক কিছু লেখা লিখব। 

পর্ব -১: কেমন আছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী_বাংলাদেশিরা

সহজ একটি কথা, উত্তরটা ও সহজ হওয়ার কথা, হয় ভালো আছেন না হয় খারাপ। কিন্তু বিষয়টি মোটেও এক কথায় উত্তর দেওয়ার মত নয়। এখানে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশী খুব ভালো আছেন আবার কেউ মালয়েশিয়ার প্রবাস জীবন কে জীবনের অভিশাপ মনে করেন।

আসুন প্রথমে জানা যাক কারা খুব ভালো আছেন। এখানে কয়েক শ্রেণীর প্রবাসীরা খুব ভালো আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম যারা বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে এখানে বেশ মজ মাস্তিতেই আছেন। আরেক শ্রেণী হলো যারা অসহায় প্রবাসীদের রক্ত চুষে দিব্যি আরামে দিনাতিপাত করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না এরা হলো দালাল। হ্যাঁ ইনারা মালয়েশিয়াতে বহাল তবিয়তে জীবন যাপন করছেন। প্রবাসী অসহায় শ্রমিকদের সরলতা এবং কম শিক্ষার সুযোগ নিয়ে এরা তাদের ঠকিয়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে। মালয়েশিয়াতে সাধারণ প্রবাসীদের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এদের বিরুদ্ধে। অনেকের মতে মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি এরাই করে। তাহলে শুনুন কি করে এই দালাল বা দালাল চক্র।

প্রথমত এই দালালদের মাঝে কয়েকটা শ্রেণী রয়েছে। যেমন: #স্টুডেন্ট_দালাল! এরা মূলত স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়াতে আসে এবং এক সময় পড়াশোনা থেকে দালালিটাকেই প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। আসলে এরা পড়াশোনা করতে আসে না আসে টাকা কামাই করতে। তাও যদি সৎ এবং সঠিক পথে টাকা কামাই করতো তবে সমস্যা ছিল না। এরা যখন বুঝতে পারে স্টুডেন্ট ভিসা তে মালয়েশিয়াতে কাজ করা বা টাকা উপার্জন করা কঠিন তখন লেজ কাটা শিয়ালের মত অন্যদের লেজ কাটা শুরু করে। দেশে নিজের পরিচিত বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের নানান রকম প্রলোভন দেখানো শুরু করে। নিজে থাকা খাওয়ার জায়গা পায় না কিন্তু দেশে কল করে বিশাল বিশাল চাপাবাজি শুরু করে। অনেকেই তাদের এই চাপাবাজি তে প্রলুব্ধ হয়ে মালয়েশিয়া আসার আগ্রহ প্রকাশ করে। এখান থেকেই স্টুডেন্ট দালালদের সুদিন শুরু হয়ে যায়। এক একটি স্টুডেন্ট ভিসা করিয়ে এরা 1 থেকে 2 লাখ টাকা কামাই করে। পুরো মালয়েশিয়া জুড়ে এমন অসংখ্য ছোট বড়ো স্টুডেন্ট দালাল আছে। এদের কেউ কেউ রাতারাতি কুটি পতি হয়ে গেছেন। আমি খুব কাছ থেকে এমন অনেক স্টুডেন্ট দালালের কথাপকতন শুনেছি, আপনাদের সাথে তাদের কিছু কথাপকতন শেয়ার করি:

দালাল: আরে তোদের দোয়াতে আমি মালয়েশিয়াতে খুব ভালো আছি। মাসে 2/3 হাজার রিঙ্গিত বেতন পাই। এই ধর বাংলাদেশের টাকায় 70-80 হাজার টাকা তো হয়েই। আর এখানে যে কি শান্তি তুই না আসলে কখনো বুঝবি না। আমি যে বাসায় থাকি ঐ টা 28 তলা, বাসার নিচে সুইমিং পুল আছে। আর বাসাতে ফ্রিজ, টিভি, এসি, ওয়াইফাই তো আছেই। ও কাপড় ধোয়ার জন্য ওয়াশিং মেশিন ও আছে। কোন কষ্ট নাই। যেখানে কাজ করি সেটা তো আরো মজা। কাজে কোন কষ্ট নাই।

তো এই রকম কথা শুনে অনেকেই তাদের জালে ধরা পড়ে। এরা ভিসা হওয়ার আগে টাকা লাগবে না, ১০০% কাজের গেরান্টি সহ নানান রকমের প্রলোভন দেখায় যার অধিকাংশই মিথ্যা। তো চলুন জানা যাক এদের কারনে কি ভাবে দেশ এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এদের কথার জালে ফেঁসে অনেকেই দেশে পড়াশোনা বন্ধ করে বিদেশের পথে পাড়ি দেয় কিন্তু মালয়েশিয়া এসে এদের পড়াশোনা আর হয়ে ওঠে না। কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে ও ভালো কোন কাজ জুটে না। কষ্ট করে কাজ জুটলেও তার ইনকাম দিয়ে নিজের দৈনন্দিন জীবনের খরচ মিটিয়ে তেমন কোন অর্থ জমা করতে পারে না ফলে এক বছর পরে কলেজের টিউশন ফি আর ভিসার টাকা জোগাড় হয়ে উঠে না। এমন অবস্থায় হয় তাকে দেশে ফিরত যেতে হয় না হয় অবৈধ হয়ে যেতে হয়।

অপরদিকে মালয়েশিয়া আসতে তাদের খরচ হয়েছে ৩ থেকে ৪ লক্ষ টাকা যা হিসেব কষলে দেখা যায় প্রকৃত খরচের দুই গুন। তাহলে চিন্তা করে দেখুন এক মাসে যদি ১০০ জন স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়া আসে তবে দেশ থেকে (400,000 × 100 = 40,000,000) প্রায় ৪ কুটি টাকা প্রচার হয়ে যাচ্ছে এবং এই টাকার অর্ধেক টাই যাচ্ছে দালালদের হাতে। যে পরিমাণ টাকা এক মাসে দেশ থেকে বাহির হচ্ছে তা আবার রেমিটেন্স হয়ে দেশে ঢুকতে ৩ থেকে ৪ বছর লেগে যাচ্ছে।

এতো গেল আসা যাওয়ার হিসাব কিন্তু তাদের বিদেশে পাঠাতে গিয়ে তাদের পরিবার কত কষ্ট করে সেই টাকা জোগান দেয় তা নিশ্চয়ই কারো অজানা নয়।

স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়া আসা এবং তাদের জীবন যুদ্ধ নিয়ে পরবর্তীতে অন্য কোন পর্বে বিস্তারিত লিখব এবার চলুন আরো কিছু দালাল সম্পর্কে জানা যাক। আরেক শ্রেণীর দালাল আছে যাদের আমরা “ভিসা_দালাল” বলতে পারি। এদের কাজ হলো বিভিন্ন ভিসার নাম দিয়ে মানব প্রচার করা। এরা কখনো কখনো স্টুডেন্ট দালালদের থেকেও ভয়ংকর হয়। এই শ্রেণীর দালালরা হরেক রকমের ভিসার নাম বলে যেমন বলে ফ্রি ভিসা। যদিও ফ্রি ভিসা বলে মালয়েশিয়ায় কোন ভিসা হয় না। মাঝে মাঝে এদের কৌশল অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়। যেমন নৌ পথে মানব প্রচার, টুরিস্ট ভিসাতে এনে বলে এখানে আসার পর ভিসা করে দিবে (যা প্রায় অসম্ভব), কিন্তু আসার পর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না।

এরাও লোভনীয় প্রলোভন দেখায় কিন্তু যার বেশির ভাগই মিথ্যে। এই শ্রেণীর দালালদের মূল লক্ষ্য কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দিকে। অনেক সময় ভিসার টাকা অগ্রিম নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এদের বেশ সুনাম আছে। আজ মালয়েশিয়াতে যত অবৈধ আছে তাদের বেশিরভাগই এদের কল্যাণে।

এবার আসুন সংক্ষেপে আরো কিছু দালাল সম্পর্কে আপনাদের জানিয়ে দেই। 

পাসপোর্ট দালাল: এদের মূলত হাইকমিশনের আশেপাশে দেখা যায়। 

সুযোগ সন্ধানী দালাল: এরা মূলত বিভিন্ন সুযোগের সন্ধানে থাকে যেমন: মাইইজি, ই-কার্ড, কলি এর মত সুযোগের সৎ ব্যবহার করে মোটা অংকের অর্থ উপার্জন করে।

কমিশন দালাল: এরা মূলত কাজ দেওয়া নাম করে কমিশন খায়। অনেক সময় এরা একজন শ্রমিকের কষ্টার্জিত উপার্জনের অর্ধেকটাই খেয়ে ফেলে।

এই কমিশন দালাল নিয়ে আমার একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে। একবার একটি ছেলে মালয়েশিয়া আসার 3 মাসের মাথায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করলে সে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তার কাছে তখন বিমানের টিকিট কাটার টাকা ছিল না। উপায় না দেখে দেশ থেকে টাকা আনলো টিকেট কাটার জন্য এবং এক ব্যক্তিকে সে টিকেট কাটতে দিল। সে ব্যক্তি ঐ টাকা থেকে কমিশন কেটে রাখলো। তাহলে বুঝুন এরা কি প্রকৃতির!

লেখাটি আজ এখানে শেষ করবো তবে আপনাদের কাছ থেকে সাড়া ফেলে পরবর্তিতে লেখাটা চালিয়ে যাব। এবং চেষ্টা করবো প্রবাস জীবনের বাস্তব চিত্র লিখার মাঝে তুলে আনতে। অবশ্যই আপনারা আপনাদের মতামত জানাবেন কোন ভুল হলে তাও জানাবেন। ধন্যবাদ মূল্যবান সময় দিয়ে লিখাটি পড়ার জন্য।

শেয়ার করুন: Facebook Twitter Google LinkedIn Pinterest Print Email

মন্তব্য ফিড সাবস্ক্রাইব করুন মন্তব্যসমূহ (0 মন্তব্য প্রকাশ হয়েছে):

মোট: | প্রদর্শন:

মন্তব্য প্রকাশ করুন comment

  • Bold
  • Italic
  • Underline
  • Quote
  • email Email to a friend
  • print প্রিন্ট সংস্করণ
  • Plain text সরল পাঠ্য
এই নিবন্ধটি জন্য কোন ট্যাগ নেই
এই সংবাদটি মূল্যায়ন করুন
0